‘অভিভাবক ব্যবস্থাপনা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক নীরব মেধাবী শিল্প’ —-এম নজরুল ইসলাম খান
- আপডেট সময় : ০৮:৪১:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ নভেম্বর ২০২৫ ২৯৭ বার পড়া হয়েছে

সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার চট্টগ্রামঃ
অভিভাবক প্রতিষ্ঠান সহযোগী প্রতিদ্বন্দ্বী নয় ।একটি প্রতিষ্ঠান অভিভাবকদের নানা রকম মানসিকতা, দাবি-দাওয়া, অভিযোগ-অনুযোগ,আশা- প্রত্যাশা এসব নিয়েই সাফল্যের পথে এগিয়ে যায় ।অভিভাবক চ্যালেঞ্জ নয় সহযোগী, দক্ষ ও কৌশলী ব্যবস্থাপনাই অভিভাবকদের মন জয় করতে পারে। অভিভাবক সন্তুষ্টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের চাবিকাঠি।
শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের অক্ষরে সীমাবদ্ধ নয়;এটি একটি জীবন্ত সম্পর্কের সেতু—যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এই তিনটি দিক একত্রে শিক্ষার পূর্ণতা রচনা করে। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, এই ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের এক প্রান্তে—অভিভাবক সমাজ।
একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মূল স্তম্ভ শুধু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নয়, অভিভাবকরা এর অপরিহার্য অংশ।
কিছু অভিভাবক তাদের সন্তানের শিক্ষার দায় নিজের কাঁধ থেকে নামিয়ে পুরোটাই স্থানান্তর করেছেন বিদ্যালয়ের কাঁধে। তাঁরা সহযোগী নন, বরং প্রায়শই দাবি-দাওয়া,অভিযোগ ও অসন্তোষের ঝড় তোলেন। বিদ্যালয়ের প্রতিটি ত্রুটি তাদের চোখে পড়ে, কিন্তু নিজেদের কর্তব্যের অভাব তারা দেখতে পান না। শিক্ষকদের ত্যাগ, বিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতা বা শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত দুর্বলতা—কোনোটিই তাদের ভাবনায় স্থান পায় না। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধুই “সেবা দানকারী সংস্থা” হিসেবে দেখা শুরু হয়েছে—যা মানবিক শিক্ষার মর্মবোধকে আঘাত করে।
এই অবস্থায় “অভিভাবক ব্যবস্থাপনা” হয়ে উঠেছে এক নীরব কিন্তু অপরিহার্য মেধাবী শিল্প। এটি কেবল প্রশাসনিক কৌশল নয়, এক প্রকার মানবতাবাদী সাধনা। অভিভাবকের অযৌক্তিক রাগ, হিংসা, অহংকার কিংবা ভ্রান্ত প্রত্যাশার মধ্যেও শিক্ষকের ধৈর্য, সহানুভূতি ও নৈতিক দৃঢ়তা বজায় রাখা—এ যেন এক যোগীর সাধনা।
অভিভাবক ব্যবস্থাপনা মানে কেবল সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া নয় বরং সহানুভূতি, যোগাযোগ,ধৈর্য ও কৌশলের মাধ্যমে সম্পর্ককে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করা ।প্রতিষ্ঠান প্রধানকে জানতে হবে অভিভাবকদের কথা কখন শুনতে হবে, কখন তাদেরকে বুঝিয়ে বলতে হবে, আর কখন চুপ থাকতে হবে।অভিভাবকদের রাগ তাদের একে অপরের সাথে সমস্যা সৃষ্টি এগুলি তাদের সন্তানদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ এবং তাদেরকে অনেক সময় বুঝিয়ে বললে সেই রাগ নিরসনও হয়।
বিদ্যালয় যদি কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা শিক্ষার অর্ধেক কাজ করে। শিক্ষার প্রকৃত কাজ হলো সমাজ ও মানসচেতনার পরিবর্তন ঘটানো। তাই অভিভাবকদের মানসিক পরিশুদ্ধি, সচেতনতা ও নৈতিক উন্নয়নেও বিদ্যালয়ের ভূমিকা রয়েছে।
শিক্ষক যদি শুধু ছাত্র শেখান, আর অভিভাবক শেখানো থেকে বিরত থাকেন, তবে শিক্ষার নদী কখনো পূর্ণ প্রবাহ পায় না।
একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শিক্ষাপ্রধান জানেন—অভিভাবককে প্রতিপক্ষ নয়, বরং সহযাত্রী করতে হয়। তাদের রাগে প্রতিক্রিয়া নয়, বরং সহানুভূতির আলো জ্বালাতে হয়। কারণ, বিরক্ত অভিভাবকের অন্তরেও লুকিয়ে থাকে সন্তানের ভবিষ্যতের প্রতি উদ্বেগ। এই উদ্বেগকেই যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তবেই সত্যিকার অর্থে শিক্ষার সমাজ গড়া সম্ভব।
অভিভাবকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ তাদের সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তাদের সাথে স্বচ্ছ ভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে আসতে পারে।
অভিভাবক ব্যবস্থাপনা আজ এক গভীর মানবিক ও দার্শনিক দায়িত্ব। এটি কোনো কর্তৃত্বের কাজ নয়—এটি সহমর্মিতার সাধনা, সম্পর্কের পুনর্জাগরণ। শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান যদি নীরবে, ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে এই শিল্পে পারদর্শী হয়, তবে শিক্ষার ভিত হবে দৃঢ়, সমাজ হবে আলোকিত, আর অভিভাবক হবেন শিক্ষার সত্যিকারের সহযোগী। তাই বলা যায়, অভিভাবক ব্যবস্থাপনা শুধু প্রশাসনিক কাজই নয়, এটি একটি মানবিক শিল্প যেখানে সম্পর্ক ও সমন্বয় শিক্ষার সেতুবন্ধন।



















