সার্টিফিকেট কেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষা বিলাসিতার নামান্তর
- আপডেট সময় : ০৪:১৩:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ নভেম্বর ২০২৫ ৩৫০ বার পড়া হয়েছে

আফরিন আলম অথৈ
দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় তার মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার প্রমাণ দিয়েছে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে গুণগত শিক্ষা, গবেষণা এবং আবিষ্কারের হার অতি নগন্য। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও মুখস্থ বিদ্যা, বহু পুরোনো নোট পড়ে শুধুমাত্র পাস করতে পারাটাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাড়িয়েছে। ফলে আমরা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও গবেষণায়, আবিষ্কারে বহু গুণ পিছিয়ে আছি। এই সমস্যার সমাধান খুজতে হলে প্রথমেই আমাদের জানা উচিত একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য কি। কোন লক্ষ্য কে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় অর্থ্যাৎ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছিলো। পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষা বলতে আসলে কি বোঝায় সেটাও জানা দরকার।
উচ্চ শিক্ষা-
যখন কোন ব্যাক্তি তার জীবন পরিচালনার জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের জ্ঞান লাভের পর কোন একটি বিষয় সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ ধারণা লাভের উদ্দেশ্য সে বিষয়ের বিস্তারিত বিষয়াদি পাঠ করে তা বাস্তবিক জীবনে প্রয়োগের ক্ষমতা লাভ করে, তখনই সে ব্যাক্তিকে উক্ত বিষয়ে উচ্চ শিক্ষিত বলা যায়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য –
১. একটি বিশ্ববিদ্যালয় কোন বিষয় সম্পর্কে প্রচলিত তথ্য ও তত্ত্ব পড়ানোর পাশাপাশি সে বিষয়ের নতুন নতুন তত্ত্ব আবিষ্কারের প্রচেষ্টা চালায়।
২. নতুন জ্ঞান কিভাবে আতঃস্থ করতে হয়, সেই নতুন অর্জিত জ্ঞান কিভাবে বাস্তবে পারিপার্শ্বিকতার প্রয়োজনে কাজে লাগাতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তা শেখানো হয়। পাশাপাশি নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে পারিপ্বার্শিকের উন্নয়ন ঘটাতে পারবে সেই পদ্ধতিও এখানে শেখাবে।
৩. যেহেতু, উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র পড়াশোনা নয়, বরং সে দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস সম্পর্কে সর্বোচ্চ ধারণা রাখবে।
পাশাপাশি দেশের মানুষের মনস্তত্ব, দর্শন, রাজনীতি ইত্যাদি সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি রাখবে।
৪. গবেষণা ও উদ্ভাবন ই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মূল কাজ বলে প্রতীয়মান হবে।
কিন্তু আমরা যদি আমাদের দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর দিকে লক্ষ্য করি তাহলে উপরে বর্ণিত লক্ষ্য গুলোর বিপরীত চিত্র দেখতে পাই।
দেশের ক্যাম্পাসগুলো মূল লক্ষ্য থেকে দূরে গিয়ে যেসব কার্যক্রমে ঝুঁকছে তার একটি তালিকা তৈরি করলে তা হবে এমন-
(১) ক্যাম্পাসে এক যুগেরও অধিক সময় ধরে চলমান দলীয় রাজনীতি, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ বিঘ্ন করেছে।
(২) ক্যাম্পাসগুলোতে মাদকের সহজলভ্যতা তরুণদের ভুল পথে অগ্রসর করছে।
(৩) সরকারি চাকরির প্রতি ঝোঁক, গবেষণায় অনিহা তৈরির অন্যতম কারণ।
লক্ষহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভঙ্গুর অবস্থার জন্য এই দেশকেই ভোগান্তিতে পরতে হচ্ছে। সম্প্রতি টাইমস্ হায়ার এডুকেশ এর র্যাংকিং এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় সেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ভরতের ২৭ টি এবং পাকিস্তানের ৮ টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে।
অর্থাৎ বহির্বিশ্বের সাথে তুলনায় আমরা উন্নত বিশ্বের সাথে পাল্লা দেওয়া দূরে থাক আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে পর্যন্ত দাড়াতে পারছি না। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যায়, ভারত কিংবা পাকিস্তানের আর্থ-সামাজিক চিত্রের সাথে আমাদের জীবনযাত্রার তেমন একটা পার্থক্য নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রায় একই ধরণের আর্থ- সামাজিক প্রেক্ষাপটে থেকেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্র গুলোতে আমরা এতটা পিছিয়ে আছি কেন?
এই দেশগুলোতেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা যায়। তবে, তাদের রাজনৈতিক নেতা কিংবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিজেরা ব্যাক্তিগত অথবা চাকরি জীবনে যতই নীতিবিরোধী হোক না কেন, অন্তত দেশীয় স্বার্থে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে।
একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় তার সার্বিক লক্ষ্যে পৌছাতে না পারলে মূলত সে দেশটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো ভাঙ্গতে শুরু করে। এর উদাহরণ হিসেবে আমরা বাংলাদেশ কেই দেখতে পারি।
আমাদের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মানে এখনও অবধি আমাদেরকে বিদেশি প্রকৌশলিদের ওপর নির্ভর করতে হয়। যেমন- পদ্নাসেতুর কথা উল্লেখ্য করা যায়। নিঃসন্দেহে এটি এদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ নির্মাণ। কিন্তু এই নির্মাণে মূল সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে-চায়না মেজর ব্রিজ ইন্জিনিয়ারিং কোম্পানি।
আবার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মূল ক্রিটিকাল অংশ যেমন- রিয়েক্টর কোর,নিরাপত্তা নির্ধারক সিস্টেম, মূল প্রযুক্তিগত সরঞ্জামাদি অধিকাংশই রাশিয়ার রোসাতম (Rosatom) কোম্পানি কতৃক পরিচালিত হচ্ছে।
অথচ আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় গুলো থেকে বিপূল পরিমাণ শিক্ষার্থী পাশ করে বেরোচ্ছে।
চিকিৎসা ব্যাবস্থার দিকে তাকালে এই ভঙ্গুর অবস্থা আরোও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। যেমন- আমরা খুব ছোটখাটো স্বাস্থ্য চেকআপের জন্য ভারতে যেতে আগ্রহী।
এবং দেশের সাধারণ মানুষও এ বিষয়টাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছে। যখন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ভারতে যেতে নিষেধাজ্ঞা তৈরি হলো, তখন রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য চীনে কীভাবে সুবিধা পাওয়া যাবে, তা ভাবতে শুরু করলাম। অথচ, নিজের দেশে কিভাবে আমরা সুবিধা ভোগ করতে পারি এ ব্যাপারে আমাদের আগ্রহ অতি সামান্য।
এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় এমন প্রতিটি বিষয়ের বাস্তবিক অবস্থা প্রায় একই রকম। অহরহ রসায়ন কিংবা জীববিজ্ঞানের শিক্ষক-শিক্ষাৌর্থী, কিন্তু মানসম্মত ল্যাব, গবেষণা নেই।
অথচ, আমরা নিজেকে তখনই স্বয়ংসম্পূর্ণ দাবী করতে পারতাম, যখন আমাদের অবকাঠামো গুলো দেশীয় প্রকৌশলীর নকশায় তৈরি হতো, যখন একজন নাগরিকের সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা দেশেই নিশ্চিত করা যেতো।
সাহিত্য, দর্শন বিষয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী সার্টিফিকেট নিয়ে বের হচ্ছে। কিন্তু, আমরা কয়েক দশকে মানসম্মত নতুন সাহিত্যিক, দার্শনিক বা চিন্তক খুজে পাচ্ছি না। উল্টো প্রতি বছর বইমেলায় নিম্নমানের রূচিহীন লেখকদের অসামাজিকা চোখে পরে।
এই সমস্যাগুলোর জন্য কি শুধুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দায় দেওয়া যায়?
আমাদের দেশীয় প্রশাসনিক দুর্বলতা-ই শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকায় মূল কারণ। দেখা যায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট জিডিপির ১.৬৯% শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কো শিক্ষায় মোট জিডিপির ৪%-৬% বরাদ্দ করার সুপারিশ দেন। এখানে, গবেষণা ও উদ্ভাবনে অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনের নীতিগত ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অভাব সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।
আবার সরকারি ভাবে গবেষণার জন্য আলাদা কোন বাজেট দেওয়া হয়না। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ইচ্ছা থাকলেও তারা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেনা, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও আনুষাঙ্গিক সুযোগ সুবিধার অভাবে। গবেষণার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়। শিক্ষকদের গবেষণার জন্য আলাদাভাবে সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। কেননা, গবেষণার মতো একটি বিষয় ব্যাক্তিগত উদ্যোগে করা মোটেও সহজ নয় বরং অসম্ভব বলা চলে।
এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি বেসরকারি ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসতে পারে। উন্নত বিশ্বে “শিল্প-শিক্ষা সংযোগ” পদ্ধতির মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে।
যেমন- ইন্জিনিয়ারিং খাত গুলোতে বিভিন্ন ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান দেশীয় প্রকৌশলীদের দিয়ে নতুন উদ্ভাবন এবং ধারণা নিতে পারেন যা তাদের ব্যাবসায়িক ক্ষেত্রে আর্থিক উন্নতিতে সাহায্য করবে পাশাপাশি গবেষকদের গবেষনাও চলমান রাখবে।
বিশ্ববিদ্যালগুলো গবেষণা ও উদ্ভাবনে পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে কুবির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুতাসিম বিল্লাহ মন্তব্য করেন, “ শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াতে বিগত সময়ে স্বজনপ্রীতির ঘটনা ঘটেছে, যারা শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নয় এমন অনেকে শিক্ষক হিসেবে জয়েন করেছে। এরকম যেমন একটা অংশ আছে আবার শিক্ষক হিসেবে যারা জয়েন করেছে তাদের রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট, ল্যাবরেটরি ফ্যাসিলিটিস, ইকোনমিকাল সাপোর্ট, তাদের রিসোর্স, ট্রান্সপোর্ট বা এই ধরনের লজিস্টিক যে সাপোর্ট প্রয়োজন তা অপ্রতুল থাকার কারণে বিশেষ করে রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট না থাকার কারণে সমস্যায় পরতে হয়। তখন তাদেরকে নিজেদের পড়াশোনাও করা লাগে আবার ক্লাস করা, খাতা মূল্যায়নও করা লাগে ফলে তারা যথাযথ ভাবে গবেষণায় মনোযোগী হতে পারেনা। আবার বিগত সময়গুলোতে শিক্ষক রাজনীতি একটি বড় প্রভাব ফেলেছে, ফলে শিক্ষকগণ তাদের মূল উদ্দেশ্যের দিকে মনোযোগ না দিয়ে বিভিন্ন পদ-পদবীর দিকে ঝুঁকেছে।”
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের দ্বায়িত্ব-
দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর শিক্ষার্থীদের অবশ্যই মাথায় রাখা উচিত যে, তারা এদেশের কৃষক-শ্রমিক থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি শ্রমজীবি মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের বিনিময়ে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের মত একটি মধ্যম আয়ের দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে এই ব্যায়ের যথাযথ মূল্যায়ন না করতে পারলে, তা দেশ ও জাতির সাথে এক ধরনের প্রতারণার সামিল বলে বিবেচিত হবে।
আর যদি পারদপক্ষে পরিবর্তন সম্ভব না -ই হয়, তাহলে সার্টিফিকেট কেন্দ্রিক পড়াশোনা সমাপ্ত করা উচিত। কেননা, শুধুমাত্র সার্টিফিকেট কেন্দ্রিক শিক্ষা আমাদের মতো একটা দেশের জন্য বিলাসিতায় বটে।
সেক্ষেত্রে আমরা চীনের ন্যায় দেশে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধাণ্য দিয়ে অর্থনীতি সচলে অগ্রসর হতে পারি।




















